বিশ্ব ভালোবাসা এবং নিষ্ঠুরতার সমন্বয়ে গঠিত। আমরা নিজেদেরকে সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রজাতি, এই পৃথিবীর শাসক মনে করি, অথচ আমরা যারা আমাদের সাথে এই পৃথিবী ভাগ করে নেয়, তাদের প্রতি নির্মমভাবে উদাসীন আচরণ করি। প্রাণীগুলো—যারা ব্যথা অনুভব করে, যারা তাদের সন্তানদের ভালোবাসে, যারা সম্পর্ক গড়ে তোলে আমাদের মতোই—তাদের আমাদের স্বার্থ, আনন্দ এবং লোভের জন্য ভয়াবহ কষ্ট ভোগ করতে হয়।

একটি মা গরু তার সদ্যজাত বাছুরকে চেটে আদর করে, তার বড়, গভীর চোখে ভালোবাসা ও স্নেহের ছাপ ফুটে ওঠে। কিন্তু তার এই ভালোবাসার কোনো মূল্য নেই তাদের কাছে যারা তাকে শুধু একটি দুধ উৎপাদন মেশিন হিসেবে দেখে। জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার বাছুরটিকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়, ছোট্ট শরীরটি ভয়ে কাঁপতে থাকে। সে তার মায়ের জন্য ডাকে, কিন্তু তার মা তাকে বাঁচাতে পারে না। তার যন্ত্রণার কান্না গোটা খামার জুড়ে প্রতিধ্বনিত হয়, কিন্তু কেউ শুনতে চায় না। সে মানুষের জন্য দুধ তৈরি করতে বাধ্য হয়, সেই দুধ, যা তার সন্তানের জন্য ছিল। আর যখন তার শরীর ক্লান্ত ও ভগ্ন হয়ে পড়ে, তখন তাকে এক টুকরো আবর্জনার মতো ফেলে দেওয়া হয়।

একটি পথশিশু কুকুর রাস্তায় হাঁটছে, তার পাঁজরের হাড় গায়ে লেগে গেছে, চামড়া ফাটা আর রুক্ষ। একসময় তার একটি পরিবার ছিল, একটি বাড়ি ছিল, কিন্তু যখন সে বৃদ্ধ এবং অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখন তাকে ফেলে দেওয়া হয়। এখন সে খাবারের খোঁজে ঘুরে বেড়ায়, মানুষের পাথরের আঘাত এড়িয়ে চলে, যারা তাকে শুধু বিরক্তিকর বলে মনে করে। তার চোখ, একসময় ভালোবাসা এবং বিশ্বাসে ভরা ছিল, এখন সেখানে শুধুই বিভ্রান্তি ও ভয়ের ছায়া। সে বুঝতে পারে না কেন এই পৃথিবী তাকে ত্যাগ করেছে।

গবেষণাগারগুলিতে, খরগোশ ও ইঁদুরগুলো নীরবে চিৎকার করে, তাদের কণ্ঠস্বর শুনতে পাওয়া যায় না যখন রাসায়নিক পদার্থ তাদের ত্বকে, চোখে জ্বালা ধরিয়ে দেয়। তারা জানে না কেন তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে, কেন তাদের শরীরে বিষ ঢালা হচ্ছে, কেন তাদের কাটা হচ্ছে। যারা এটাকে "উন্নতি" বলে দাবি করে, তাদের কাছে তাদের জীবনের কোনো মূল্য নেই। এই ব্যথা লুকিয়ে রাখা হয় বন্ধ দরজার পিছনে, যেখানে নিষ্ঠুরতা বিজ্ঞানের নামে আড়াল করা হয়।

কসাইখানায়, শূকর—যারা শান্ত ও বুদ্ধিমান প্রাণী, যারা স্বপ্ন দেখে এবং খেলে, কুকুরের মতোই—তাদের ধাতব কক্ষে ঠেলে দেওয়া হয়, যেখানে গ্যাস তাদের ফুসফুসে ঢোকে, ভেতর থেকে পোড়ায়। তারা বাতাসের জন্য লড়াই করে, বাঁচতে চায়, কিন্তু মুক্তির কোনো উপায় নেই। তাদের জীবন, তাদের ব্যক্তিত্ব, তাদের অনুভূতির কোনো মূল্য নেই তাদের কাছে, যারা শুধু তাদের খাবার হিসেবে দেখে।

আমরা মানুষ সিদ্ধান্ত নিই কখন ভালোবাসব এবং কখন হত্যা করব। আমরা একটি বিড়ালের মাথায় হাত বুলাই, আর গরুর মাংস খাই। আমরা একটি কুকুরের উচ্ছ্বাস দেখে হাসি, কিন্তু একটি শূকরের কান্নাকে উপেক্ষা করি। আমাদের সুবিধার উপর ভিত্তি করে আমরা নির্ধারণ করি কোন জীবন মূল্যবান এবং কোনটি নয়।

কিন্তু প্রাণীরা কোনো বস্তু নয়। তারা আমাদের জন্য ব্যবহারের, শোষণের বা ত্যাগের জন্য জন্মায়নি। তারা ব্যথা অনুভব করে, তারা তাদের মৃতদের জন্য শোক প্রকাশ করে, তারা আমাদের মতোই ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা করে। তারা বাঁচার, ভালোবাসার, এবং নির্ভয়ে থাকার অধিকার রাখে।

হয়তো একদিন আমরা তাদের চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখতে শিখব। হয়তো একদিন আমরা বুঝতে পারব, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমরা কতটা ভয়াবহ অত্যাচার চালিয়ে গেছি। এবং হয়তো একদিন আমরা অবশেষে নিষ্ঠুরতার পরিবর্তে দয়া বেছে নেব।

Comments

Popular posts from this blog

ক্রিপ্ট: তোমরা তো মনে কর আমাদের মেরে তোমরা শক্তিশালী হচ্ছ বুদ্ধিমান হচ্ছ